মাসিক চক্র ও মানসিক স্বাস্থ্য

পিরিয়ড। মেয়েদের জীবনে প্রতি মাসে একবার করে আসা একটি যন্ত্রণার নাম! ভালো লাগুক বা ভালো না লাগুক মাসিক বা পিরিয়ড প্রতি মাসে হওয়াটাই স্বাভাবিক, হঠাৎ না হলেই বরং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। জীববিজ্ঞানের ভাষায় মাসিক চক্র বলতে নারীদেহের ২৮ দিনের পর্যায়ক্রমিক হরমোন স্তর ওঠানামা কে বোঝায়।  হরমোনাল এই ওঠানামা, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের পরিবর্তন, শরীর এবং মন উভয়ের উপরই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।  জেনিফার মিনামি, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, বলেছেন এই হরমোনের পরিবর্তন বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে, যা মেজাজ, জ্ঞান এবং এমনকি মেডিকেল কন্ডিশনকে প্রভাবিত করে।

একটি গবেষণায় ২৪৮ জন মহিলার দুটি মাসিক চক্র জুড়ে হরমোনের স্তর বিশ্লেষণ করে মাসিকের সময় হরমোনের ঘনত্বের পরিবর্তনের সাথে হতাশা বা উদ্বেগের অনুভূতির উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গবেষণাতে আরো জানা যায়, যে সমস্ত মহিলারা ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতায় ভোগেন, মাসিকের সময় তাদের মেজাজ খারাপ হওয়া সহ PMS-এর গুরুতর লক্ষণ প্রকাশের ঝুঁকি অনেক বেশি।  লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় ৬০ জন অংশগ্রহণকারীর মাসিক চক্রের মাঝামাঝি সময়ে মেজাজের একটি নির্দিষ্ট উত্থান এবং পতনের চিত্র তুলে ধরে।  এতে জানা যায় যে মাসিক চক্রের শেষে ফলিকুলার পর্বে  ইতিবাচক মেজাজ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি এবং নিম্ন মেজাজ এবং নেতিবাচক অনুভূতি হ্রাস পায়। ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যে প্রফুল্লতা, বন্ধুত্ব, একাগ্রতা এবং কার্যকলাপের বৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ক্লান্তির অনুভূতি হ্রাস পেয়েছে।

মাসিকের সময় হরমোনাল পরিবর্তন শরীর এবং মস্তিষ্ককে নানাভাবে প্রভাবিত করে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল Premenstrual Syndrome (PMS) এবং Premenstrual Dysphoric Disorder (PMDD).

Premenstrual Syndrome (PMS)

ঋতুস্রাবের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দেহে হরমোনের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়।  এই পরিবর্তনের ফলে মাসিকের আগে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন ক্লান্তি, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, ফোলাভাব, অনিদ্রা, স্তনের কোমলতা, মাথাব্যথা, এবং জয়েন্ট বা পেশী ব্যথা।  মস্তিষ্কের উপর যেসব প্রভাব পড়তে পারে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: মেজাজের ওঠানামা বা মুড ফ্লাকচুয়েশন, বিষণ্নতা, বদমেজাজ বা উদ্বেগ।  এছাড়া, অনেকের মনোযোগের সমস্যা দেখা দেয়। এ লক্ষগগুলো Premenstrual Syndrome(PMS) নামে পরিচিত। ধারণা করা হয় যে প্রতি 4 জন মহিলার মধ্যে 3 জন প্রিম্যানস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোমের কোনো না কোনো ধরন অনুভব করেছেন।

মহিলারা কেন PMS এ ভুগেন তা পুরোপুরি জানা যায় না। তবে এটি মাসিক চক্রের সময় তাদের হরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের কারণে হতে পারে। কিছু মহিলা অন্যদের তুলনায় এই পরিবর্তনগুলির দ্বারা বেশি প্রভাবিত হতে পারেন।

যারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত, মাসিকের আগে তাদের অবস্হার অবনতি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ হতাশা, উদ্বেগ, ক্রনিক পেইন ডিসঅর্ডার, বিপিডি, আইবিএস এবং রিউমাটোলজিকাল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই মাসিকের আগে তাদের অবস্থার অবনতি অনুভব করে। Medical News Today জার্নালের মতে সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও জানা গেছে যে, মাসিকের আগে অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার-অ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (ADHD) আক্রান্তদের অবস্থার অবনতি হতে পারে।  

প্রি মেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (PMDD)

PMS এর গুরুতর রূপ হল PMDD. PMDD হল একটি গুরুতর মানসিক ব্যাধি। এর লক্ষণগুলো সাধারণত একজন মহিলার মাসিকের কয়েক দিন আগে দেখা দেয়।  গবেষণা দেখায় যে 3-8% মহিলারা PMDD-তে ভোগেন।  এর কিছু কারণ হতে পারে মাসিকের সময় প্রজেস্টেরন সংবেদনশীলতার পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক হরমোন ফাংশন। PMS-এর মতো, PMDD-এর সঠিক কারণগুলি অজানা, তবে একটি প্রধান কারণ হল উচ্চ মাত্রার স্ট্রেস।

 

PMDD এর লক্ষণ:

PMDD-এর প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে চরম মেজাজ অনুভূত হওয়া, মানসিকভাবে আচ্ছন্ন বোধ, উদ্বেগ, বিরক্তি, মনোযোগ দিতে সমস্যা এবং স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপে আগ্রহ হ্রাস।  এছাড়াও, পিএমডিডি শারীরিক উপসর্গও সৃষ্টি করতে পারে, যেমন বমি বমি ভাব, ফোলাভাব, মাথাব্যথা এবং পিঠে ব্যথা।  এই শারীরিক লক্ষণগুলি মেজাজের উপর নেতিবাচক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

পিএমডিডি একটি দীর্ঘস্থায়ী কন্ডিশন, অনেক মহিলাই জানেন না যে তারা এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারেন।

PMDD শুধুমাত্র মাসিক চক্রের luteal পর্যায়ে ঘটে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে যারা PMDD তে ভুগছেন তারা সহজেই উদ্বেগ এবং হতাশার মতো ব্যাধিতে আক্রান্ত হন।

মাসিক চক্রের সময় মানসিক স্বাস্থ্যের পরিবর্তন কীভাবে পরিচালনা করব?

মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মাসিক চক্রের প্রভাব নির্ণয়ে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে প্যাটার্ন খুঁজে বের করা। কয়েকটি মাসিক চক্র জুড়ে একজন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন মেজাজ এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যের লক্ষণগুলি ট্র্যাক করতে পারে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন চার্টিং পদ্ধতি যেমন ক্যালেন্ডার বা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। নিদর্শনগুলো শনাক্ত করার পর ব্যক্তি নিজেকে উপসর্গের ওঠানামার জন্য প্রস্তুত করতে পারবেন এবং তার প্রিয়জনদের জানাতে পারেন। ফলে প্রিয়জনদের পক্ষে তাকে আরও ভাল সহায়তা প্রদান সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, যেমন নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্য, শিথিলকরণ ব্যায়াম এবং সামাজিক সংযোগ বজায় রাখা মানসিক সুস্হতায় সাহায্য করতে পারে।  তবে লক্ষণগুলো গুরুতর বা স্থায়ী হলে পেশাদার সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষত আপনি যদি মনে করেন যে আপনার PMDD এর লক্ষণ রয়েছে, তাহলে আপনার প্রয়োজনীয় সাহায্য পেতে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।

 PMDD-এর বর্তমান চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে জীবনধারা ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে খাদ্যের সমন্বয়, শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, এবং ওষুধ নির্ধারণ করা অন্তর্ভূত।

 

 

ফাতিমা তুয যোহরা

অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE REPLY

Your email address will not be published. Required fields are marked *