মানুষ নানা কারণে বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভুগে, যার মধ্যে একটি মারাত্মক কিন্তু যথেষ্ট অবহেলিত ডিসঅর্ডার হলো “সিজোফ্রেনিয়া”। এটি যেমন রোগীর জীবনকে প্রভাবিত করে, তেমনি সমাজে তার আশেপাশের মানুষদেরও প্রভাবিত করে। এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা না থাকায়, রোগী খুব দেরিতে চিকিৎসার দ্বারস্থ হন এবং সমাজে অন্যদের তাচ্ছিল্যের শিকার হন। ফলে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাই, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে, আমাদের থাকতে হবে সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে সঠিক ধারণা এবং জানতে হবে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
- সিজোফ্রেনিয়া কী?
সিজোফ্রেনিয়া হলো এমন একটি গুরুতর মানসিক সমস্যা যা রোগীর চিন্তাভাবনা, অনুভূতি ও আচার আচরণকে প্রভাবিত করে। এর ফলে রোগীর বিভ্রম, হ্যালুসিনেশন হয়, চিন্তাভাবনা ও কথাবার্তা অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে যা পরবর্তীতে রোগীর দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বুঝতে পারেন না বা স্বীকার করেন না যে তার কোনো মানসিক রোগ আছে।
- কাদের হয়ে থাকে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি ৩০০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হোন। এ রোগের উপসর্গগুলো সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালের শেষের দিক থেকে শুরু করে ৩৫ বছরের মধ্যে দেখা দিতে পারে। এটি নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- লক্ষণসমূহঃ
সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের মধ্যে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। বেশ কিছু লক্ষণ আছে, যেগুলো স্বাভাবিক ও সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষদের মধ্যে দেখা যায় না। এগুলো হলো মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ। যেমনঃ ডিলিউশন, হ্যালুসিনেশন, বিশৃঙ্খল কথাবার্তা ইত্যাদি। এছাড়াও, একজন সিজোফ্রেনিয়ার রোগীর নিজের প্রতি যত্ন কমে যায় এবং স্বাভাবিক আচরণ, ইচ্ছাশক্তি ও সামাজিকতা লোপ পায়।
মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণসমূহঃ
ডিলিউশনঃ বেশিরভাগ সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের ডিলিউশন হয়। এক্ষেত্রে, রোগীরা ভ্রান্ত বিশ্বাসের মধ্যে থাকেন, অর্থাৎ তারা এমন কিছু বিশ্বাস করেন যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। যেমনঃ তাদের মনে হতে পারে যে কেউ তাদের ক্ষতি করতে চাচ্ছে অথবা শীঘ্রই কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। তারা এটাও ভাবতে পারেন যে তাদের কোনো অলৌকিক ক্ষমতা আছে। আবার, অনেক সময় মনে করেন যে, তাদের চিন্তা ভাবনা অন্যরা শুনে ফেলছে বা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ বাস্তবে এর কোনোটাই সত্য নয়।
হ্যালুসিনেশনঃ হ্যালুসিনেশন হলে রোগী এমন কিছু শুনতে বা দেখতে পান, স্পর্শ করতে পারেন অথবা কোনো কিছুর গন্ধ পান, যা রোগী বাদে অন্য কেউ অনুভব করতে পারেন না। সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের কাছে এগুলো বাস্তবে হচ্ছে বলে মনে হয়। বাস্তব ও অবাস্তব ঘটনাগুলোর মধ্যে তারা খুব একটা পার্থক্য করতে পারেনা। হ্যালুসিনেশন যেকোনো ইন্দ্রিয়ের সাথেই জড়িত থাকতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী কানে অবাস্তব কথাবার্তা বা শব্দ শুনতে পায়।
বিশৃঙ্খল কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনাঃ অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনার কারণে রোগীদের কথাবার্তাও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। অনেকসময় তারা অন্যদের সাথে ঠিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেন না। দেখা যায়, তাদেরকে কোনো প্রশ্ন করলে, তারা সম্পূর্ণ উত্তর দেয় না, আর দিলেও, উত্তরগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত থাকে না। কথাবার্তায় হয়তো এমন সব শব্দ ব্যবহার করেন, যেগুলোর কোনো সঠিক অর্থ নেই। রোগী অনেক ক্ষেত্রে একা একাই কথা বলতে থাকেন।
অস্বাভাবিক মোটর আচরণঃ রোগী অনেকক্ষেত্রে শিশুসুলভ আচরণ করে থাকেন। আবার কোনো কারণ ছাড়াই আগ্রাসী আচরণ করে উঠেন। অন্যদের মারধর করতে থাকেন বা করার চেষ্টা করেন।
সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলো এবং এদের মাত্রা একেক রোগীর জন্য একেকরকম হতে পারে। সময়ের সাথে সাথে এই লক্ষণগুলো ভালো কিংবা খারাপের দিকে যেতে পারে। আবার কিছু কিছু উপসর্গ সবসময়ই রোগীর মধ্যে দেখা যায়।
- সিজোফ্রেনিয়া কেন হয়?
সিজোফ্রেনিয়া কেন হয়, তার কোনো নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি। তবে, অনেক গবেষকরা মনে করেন, জিন অর্থাৎ বংশগত, মস্তিষ্কের গঠন ও পরিবেশগত কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। যেমনঃ
- ৫০ শতাংশ মানুষদের সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার জন্য জিনকে দায়ী করা হয়। তবে, কোন কোন জিন এর জন্য দায়ী, তা এখনো জানা যায়নি। সাধারণত, বংশে কারো সিজোফ্রেনিয়া থাকলে, আরেকজনের হতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জনের মা কিংবা বাবার সিজোফ্রেনিয়া থাকে।
- মস্তিষ্কে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে।
- কখনো কখনো মদ্যপান বা মাদকসেবন করলে, অল্প বয়সে এ রোগ দেখা দেয়। যেমনঃ বর্তমানে প্রমানিত হয়েছে যে, গাঁজা সেবন করলে সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ হয়ে যায়।
- শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়, যদি মায়ের ইনফেকশন বা অপুষ্টি দেখা দেয়, অথবা জন্মের সময় কিছু অসুবিধার জন্য যদি শিশুর মস্তিস্ক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে পরবর্তীতে সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
- অনেক্ষেত্রে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।
- চিকিৎসা ও থেরাপিঃ
সিজোফ্রেনিয়া সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও, এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তবে, সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার মাধ্যমে উপসর্গগুলোর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। এক্ষেত্রে, যা যা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা হলোঃ
ওষুধ সেবনঃ সিজোফ্রেনিয়া রোগীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামুলক চিকিৎসা পদ্ধতি হলো ওষুধ সেবন করা। সাধারণত, এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সারা জীবন রোগীদের ওষুধ খেতে হয়। এর ফলে বেশ কিছু লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে। কোনো ওষুধ কমাতে চাইলে বা বন্ধ করতে চাইলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে লক্ষণগুলো আবার দেখা দেয়। তবে, সাথে সাথে না হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছয় মাসের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয় আবার।
সাইকোলজিকাল থেরাপিঃ ওষুধ সেবন করা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে, যথাসম্ভব সুস্থ থাকতে ও স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসতে হলে অন্যের সাহায্যও প্রয়োজন। ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট বা সাকায়াট্রিস্ট এর কাছে “কগ্নিটিভ বিহেভিয়র থেরাপি” নেওয়া যেতে পারে। এতে করে রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সমস্যা মোকাবেলা করতে শিখেন। এই থেরাপি রোগীর হ্যালুসিনেশন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। এর পাশাপাশি রোগী অন্যান্য সহযোগিতামূলক থেরাপি নিতে পারেন।
- আপনজন হিসেবে রোগীর প্রতি আমাদের কর্তব্যঃ
সিজোফ্রেনিয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই রোগী নিজের অবস্থা বুঝতে পারেন না। সুতরাং, সময়মত চিকিৎসকের শরণাপন্নও হয় না। কারো সিজোফ্রেনিয়া হলে, তার উপসর্গগুলো শনাক্তকরণে সবচেয়ে ভালো ভুমিকা রাখতে পারেন তার পরিবারের সদস্যগণ বা তার বন্ধুবান্ধব। রোগী অস্বাভাবিক আচরণ করলে, তারা সহজে সেটা বুঝতে পারেন। এক্ষেত্রে, সিজোফ্রেনিয়ার এক বা একাধিক উপসর্গ দেখা গেলে, সবার আগে নিজেদের মেনে নিতে হবে যে, রোগী মানসিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এরপর, রোগীকে তার ইচ্ছায় কিংবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কোনোভাবেই এগুলো অবহেলা করা যাবে না। তাছাড়া, রোগীর এই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সময় আপনজনের উৎসাহ ও সহযোগিতা পেলে, দ্রুত লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদেরকে অনেকেই অহেতুক ভয় পায়। অথচ, এই রোগীরা সাধারণত কোনো সহিংসতায় জড়ায় না এবং নিজেদের মতোই থাকতে পছন্দ করেন। তাই তাদেরকে ভয় পেয়ে দূরে ঠেলে না দিয়ে, পাশে দাড়িয়ে উৎসাহ দেওয়া উচিত। তবে হ্যা, সঠিক সময় চিকিৎসা ও থেরাপি না করালে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হয়। অনেকক্ষেত্রে রোগীদের মধ্যে আত্নহত্যা বা হত্যা করারও প্রবণতা দেখা দেয়। সুতরাং, যতো দ্রুত রোগীর লক্ষণগুলো শনাক্ত করে চিকিৎসা করা যায়, তত ভালো।
References:
https://www.rcpsych.ac.uk/mental-health/translations/bengali/schizophrenia
https://www.relainstitute.com/bn/blog/what-is-schizophrenia/
https://www.msn.com/en-us/health/condition/Schizophrenia/hp-Schizophrenia?source=conditioncdx
https://bangla.thedailystar.net/life-living/wellness/news-571801
সুস্মিতা মমতাজ রিম্পা
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
