আমি যেভাবে কোভিড-১৯ মহামারীর মাঝে ইতিবাচক মনোভাব ধরে রেখেছি

আসসালামুয়ালাইকুম, আমার নাম আরিফুর রহমান রিফাত। আমি নোয়াখালী সরকারি কলেজে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করি৷ আমি প্রাণিবিদ্যা বিভাগে পড়ি৷  আজ আমি আমার কোভিড – ১৯ মহামারীতে ইতিবাচক মনোভব ধরে রাখার অভিজ্ঞতা শেয়ার করব৷

একটু পেছনের গল্প থেকে শুরু করি৷  ফেব্রুয়ারীর ২২ তারিখ আমার অনার্স থার্ড ইয়ার ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়৷  প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষার জন্যে তখন প্রস্তুতি নিচ্ছি৷  এর মধ্যে মার্চের ০৫ তারিখ থেকে ক্যাম্পাসে আন্তঃবিভাগ বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়৷  আমি বিতর্ক প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি৷  ০৮ মার্চ  সম্ভবত প্রথম কোভিড – ১৯ ধরা পড়ে বাংলাদেশে৷ টেলিভিশন,  পত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা নিয়ে ঝড় উঠে৷  আমি আমার কাজে ব্যস্ত থাকায় আর এসবে মনোযোগ দিইনি৷ ২১ মার্চ বিজ্ঞান প্রজেক্ট, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী প্রোগ্রাম এসব নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি৷  এর মধ্যে ১৬ মার্চ হঠাৎ করে ঘোষণা আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের খবর শুনে আমার টনক নড়ে, বুঝতে পারলাম কোভিডের সংক্রমণ বাড়ছে৷

আমার মূল বাড়ী হচ্ছে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়, পড়াশোনার সুবাদে থাকি জেলা শহর মাইজদীতে৷ বাড়ীতে যাব নাকি যাব না এই নিয়ে দোটানায় পড়ে যায়৷ আমার তিনটি টিউশনি ছিল৷ বাড়ীতে চলে গেলে টিউশনি চলে যেতে পারে এই আশঙ্কায় বাড়ীতে যাচ্ছি না৷ এদিকে মেস ছেড়ে একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। শেষমেষ ২৫ শে মার্চ জেলা সদর থেকে আমার বাড়ীতে চলে যায়৷ ২৬ শে মার্চ থেকে সারাদেশে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়৷

আমার বাবা ঔষধ কোম্পানীতে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করে৷ তাই করোনা সংকট আসার পর ও আমার আব্বুর চাকরি চলে৷ অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে এ কারণে তেমন একটা পড়তে হয়নি৷ এই মহামারীর সময়ে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল নিজেকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখা৷ কোভিডের এই সময়ে বাসায় সারাদিন একা একা বসে থাকা লাগতো, পড়াশোনার চাপ ও ছিল না৷ আর অলস মস্তিষ্কে তো কত রকম আজেবাজে চিন্তা কাজ করে।  তাই প্রথম থেকে মানসিকভাবে ফিট থাকার চেষ্টা করি৷

কোভিড – ১৯ সংক্রমণের পর থেকে বাসায় বসে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটাই৷  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন এই রোগ নিয়ে নানা রকম মিথ্যা,  অসত্য,  গুজব,  প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পড়ে৷  ইতিবাচক মনোভব ধরে রাখার জন্যে আমি প্রথম থেকে এসব খবর এড়িয়ে চলি৷  যে কোন নিউজ সরাসরি প্রথমে বিশ্বাস করি না, যাচাই- বাছাই/ অনুসন্ধান করে তারপর বিশ্বাস করি৷  কোভিডের বৈশ্বিক ও দেশীয় খবরাখবর জানতে প্রথম সারির নিউজ পোর্টাল,  পত্রিকা,  টেলিভিশনের উপর জোর দিই৷  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব গ্রুপে বেশি অসত্য, ভুয়া খবর ছড়ায় সেসব গ্রুপ,  পেজ থেকে বেরিয়ে আসি৷  টেলিভিশনে নিয়মিত করোনা ভাইরাস নিয়ে আইসিডিডিআরবির বুলেটিন  দেখি৷  কোভিড – ১৯ থেকে বাঁচতে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এসব কিছু বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে জেনে নিই৷

সারাদিন একা একা বসে থাকার চেয়ে নিজেকে একটা কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি৷  বাসায় সারাদিন বসে বসে বিভিন্ন ধরনের উপন্যাস পড়া শুরু করি৷  করোনা সংকটের মধ্যে আমি প্রায় ২৫+ বই পড়ি৷  বই পড়ার ক্ষেত্রে নিজের সংগ্রহে তেমন বই না থাকায় অনলাইন থেকে পিডিএফ ডাউনলোড করে পড়া শুরু করি৷  এই প্যানডেমিক সিচুয়েশনে ফেসবুকে অনেকে তাদের গুগল ড্রাইভে সংগৃহীত বই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়৷  ফেসবুকের অজস্র পেজ আইডিতে নানা রকম বইয়ের ডাউনলোড লিংক পাই৷  সেসব লিংক থেকে অনেক বই ডাউনলোড করি৷  বইপ্রেমীদের বিভিন্ন গ্রুপ থেকে বই রিভিউ দেখে কোন কোন বই পড়ব সেই তালিকা তৈরি করি৷  শুধু বই পড়ায় সীমাবদ্ধ ছিলাম না,  বই রিভিউ লিখে ফেসবুকে অনেক গ্রুপে পোস্ট করি৷

সম্ভবত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ডিপার্টমেন্টের একজন স্যার এই মহামারী সময়ে আমাদের মানসিকভাবে ফিট রাখার জন্যে ডিপার্টমেন্টের ফেসবুক গ্রুপে “অনলাইন অ্যাসাইনমেন্ট প্রতিযোগিতা” আয়োজন করে৷ স্যার ” করোনা মহামারীর পিছনে মানবজাতির ভূমিকা “, ” করোনা উত্তর বিশ্ব ও বাংলাদেশ “, ” করোনার প্রভাবে প্রকৃতির পরিবর্তন ” ” করোনায় শিক্ষার্থীদের করণীয়”, “আমিই যখন সাহিত্যিক ” ইত্যাদি শিরোনামে অনলাইনে অ্যাসাইনমেন্ট নেই৷ আমি ও কয়েকটিতে অংশগ্রহণ করি এবং টপ পজিশনে থাকি৷

করোনা মহামারীতে শুধু নিজে সচেতন না থেকে সবাইকে সচেতন রাখার চেষ্টা করেছি৷ বাইরের জেলা থেকে কেউ গ্রামে আসলে তাকে হোম কোয়ারান্টাইনে রাখার চেষ্টা করি৷ এছাড়া করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে মিথ্যে ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দূর করার চেষ্টা করি৷

করোনার এই সংকটময় সময়ে একটু আধটু ভালো কাজ করার চেষ্টা করি৷ আমি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ করি৷ সেই সংগঠনের পক্ষ থেকে আশেপাশের গরীব দুঃখীদের খাদ্য সামগ্রী প্রদান করি৷

আমাদের ডিপার্টমেন্টের ফেসবুকে একটা গ্রুপ ছিল,  পড়াশোনা রিলেটেড৷  কেউ কখনো তেমন সে  গ্রুপে পোস্ট করতো না৷ করোনার এই সময়ে সবার অনলাইন এক্টিভিটিস বেড়ে যাওয়ায় সেই গ্রুপ নিয়ে কাজ করি৷  সবাইকে নিয়ে “জ্ঞানচর্চা ক্লাব ” নামে সেই গ্রুপ সক্রিয়করণের চেষ্টা করি৷  প্রথম প্রথম সেই গ্রুপে বই রিভিউ,  একাডেমিক পড়াশোনা,  চাকরির পড়াশোনা রিলেটেড পোস্ট শেয়ার করি৷  পরে সেই গ্রুপের নাম পরিবর্তন করে Zoolologian: The Untold  Story নাম দেওয়া হয়৷  আমরা প্ল্যান করেছি  কলেজ খুললে আমরা এই নামে আমাদের ক্লাব প্রতিষ্ঠিত করবো৷ ইতিমধ্যে এই গ্রুপে আমরা জাতীয় বাজেট ২০২০-২১ ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করি এবং অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজন করি৷

এছাড়া পরিবারের সবাইকে মানসিকভাবে ফিট রাখার জন্যে ঘরে বসে বিভিন্ন খেলাধুলা করি৷ সবাই বসে একসাথে টিভি দেখি বাসার ছোট বাচ্চাদের পড়াশোনা করায়৷

প্রত্যেকদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজর নামাজ পড়ে ০১ ঘণ্টা গ্রাম্য নির্জন রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করি৷ ইদানীং ফটোগ্রাফির কাজ শুরু করি৷ এছাড়া ইউটিউবে কবিতা আবৃত্তির বিভিন্ন ভিডিও দেখে কবিতা আবৃত্তি চর্চা শুরু করি৷ মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে দেখা করি৷ নিজেকে সবসময় মানসিকভাবে উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করি৷

করেনার এই সংকট সময়ে নানা রকম ইতিবাচক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখে নিজের ইতিবাচক মনোভব ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি৷ এই হলো আমার করোনা সংকটকালীন সময়ের গল্প৷

 

Arifur Rahman Rifat

University Category

GB100

 

 

 

LEAVE REPLY

Your email address will not be published.