বাংলাদেশ এ গতানুগতিক সময়ে সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা হলো যৌন নিপীড়ন যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজকে হুমকির মুখে ফেলছে। শিশুরাও সমাজের নির্মম চিত্র থেকে কোনো অংশে দূরে নেই। যৌন নিপীড়ন একজন শিশুকে শুধু শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেনা, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে। অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ, জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক তৈরি বা ধর্ষণ, অশ্লীল মন্তব্য করা, কোনো ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ এসকল অনৈতিক কার্যক্রম যৌন নিপীড়ন বলে গণ্য হয়। শিশুরা তাদের অপরিপক্কতার কারণে বুঝে উঠার আগেই সবকিছু হয়ে যায় যা পরবর্তী জীবনে শিশুকে ভুগায়, মানসিক অবসাদ এবং সোশ্যাল অ্যানজাইটি, ট্রমা তৈরি করে শিশুর সুষ্ঠ এবং মানসিক বিকাশ কে বাধাগ্রস্ত করে।
আসুন নিচে শিশুর উপর হওয়া যৌন নিপীড়ন এর দুইটি ঘটনা পড়ি:
Story 1-
অসমতা নাকি অপারগতা?
শেষ বিকেলে বারান্দায় বসে রবিন বাইরে দেখছে তার মতো অনেকেই খেলা করছে দেয়ালের ওপাশের মাঠটায়। সেও চায় খেলতে কিন্তু ওর আর মানুষগুলোর মাঝে থাকা দেয়ালটা পেরোতে চায়না সে। তার মাথায় সাইকেলের বেয়ারিং এর মত ঘুরতে থাকে কিছু খেয়াল। এরই মাঝে মা ডাক দেয়। “রবিন, মামার বাসায় যাই চল। কালকে তো স্কুল বন্ধ। দুই দিন থেকে আসব।” রবিন মামার কথা শুনেই আতকে উঠে।
রবিনের বয়স তখন ছয় কি সাত হবে। মামার বাসায় বেড়াতে যায় ঈদ এর লাল পোকেমন গেঞ্জীটা পড়ে। মা ব্যস্ত থাকায় মামার সাথেই গোসল করতে যায় রবিন। তারপর এর স্মৃতি হয়তো রবিনের জন্য বিস্মৃতি হলেই বোধহয় ভালো হতো। রবিন কে নোংড়া স্পর্শ করার এক পর্যায়ে মামা… “কিরে রবিন, তৈরি হস নি এখনো?” থমকে যায় রবিনের ভাবনা গুলো।
রবিন জানেনা আজ অবধি কতবার এভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। গুনতে ভুলে গেছে সে। দশ? পনেরো? নাকি আরো বেশি? মানুষের মাঝে যেতে ইচ্ছে করেনা রবিনের। মনে হয় তার গায়ে নোংড়া হাত রাখবে সবাই। লজ্জায় কিছু বলতে পারেনা সে মাকে। কি ভাববে মা? তার ছেলে কাপুরুষ হয়েছে? নিজেকে ঘৃণা করে সে। নিজের পুরুষত্ব কেও। সাত বছরেও যে প্রতিবাদ করতে পারেনা তার আবার কিসের ব্যক্তিতবোধ? কিসের আত্মমর্যাদা?
Story 2-
ধর্ষনের সাবলীল দৌরাত্ম্য
বাবা তাকে ও তার মাকে রেখে চলে যাওয়ার পর থেকেই জীবন বদলে যায় শিউলির। বহু বিড়ম্বনা, কানাঘুষা এবং অবজ্ঞায় বড় হয় সে। অবশেষে মার নতুন বিয়েটা হলে শিউলি ভাবে এবার হয়তো আর নিজেকে তার অবাঞ্ছিত বলে মনে হবেনা।
তখন ক্লাস ফাইভ এ পড়ে শিউলি। সেদিন মা বাড়ি ছিলেন না। কি একটা কাজে বেড়িয়েছেন। নিজের ঘরে বসে স্কুলের পড়া করছিল শিউলি। হঠাৎ তার সৎ বাবা তার ঘরে এসেই দরজা আটকে দেন। শিউলি কিছু বুঝে উঠার আগেই প্রথমে জোরপূর্বক স্পর্শ এবং পরে ধর্ষনের শিকার হতে হয় শিউলি কে।
দিন দিন নিস্তেজ হতে থাকে শিউলি। তার সাথে আসলে কি হয়েছে তা বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যায়। ততদিনে তার ছোট ভাই রাতুল জন্ম নিয়েছে। দেখতে দেখতে ওই পিশাচটাকে “বাবা” ডাকা শুরু করে রাতুল। ভীষন কষ্ট হয় শিউলির। সে চায়না তার মা আবার সেই আগের দিনগুলোয় ফিরে যাক। আবারো সংসার ভাঙার দায়ে সমাজের কাছে কলুষিত হোক মা। তাই সে কিছু বলতে চায়না মা কে। নিজেকে “নষ্ট” বলে মনে করে শিউলি। কেমন উদ্ভট একটা অনুভূতিতে তলিয়ে যায় সে। ঘৃণা? ক্রোধ? নাকি উৎকটতা? ভেবে পায়না সে।
**উপরের ঘটনাগুলো হয়তো নিতান্তই কাল্পনিক দৃশ্যকল্প মাত্র। কিন্তু এই রবিন কিংবা শিউলির অনুভূতিগুলোও কি কাল্পনিক? উত্তর হলো “না”। আমাদের এই সাশ্রয়ী নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজ এমন বহু রবিন-শিউলির জন্ম দিয়েছে। যৌণ নিপীড়নে উৎখাত করেছে বহু পুষ্পসুলভ শিশুর সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠার মানসিকতা।
উপরের উল্লেখিত দুটি ঘটনায় একটি মিল দেখা যায়। দুঃখজনক হলেও সত্যি বাংলাদেশ এ শিশুরা সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়ন এর শিকার হয় নিজের বাসায়, পরিবারের সদস্য কিংবা পরিচিত আত্মীয় দ্বারা। যার ফলে শিশুরা চাইলেও মুখ খুলতে পারেনা। এবং নিতে হয় প্রচুর মানসিক চাপ। বর্তমানে সারা দেশে আছিয়ার ঘটনা জনমনে খুব সারা ফেলেছে। বোনের বাড়িতে যাওয়ার পর গত ৮ মার্চ মাগুরায় তার বোনের শুশুর এবং দুলাভাই দ্বারা ধর্ষণের স্বীকার হয়। এই ঘটনা এতটাই নির্মম যে সারাদেশে মানুষকে ভাবাচ্ছে। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক জরিপে অংশগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে যে, তারা পরিবারের ভেতরেই যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এই তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, শিশু যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে অপরাধী অনেক সময় পরিবারের সদস্য বা পরিচিতজন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রথম আলো এবং সমকাল পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিশু নির্যাতনের ৭৬ শতাংশই যৌন নিপীড়নের ঘটনা। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে হয়রানি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশ দরিদ্র জনবহুল দেশ।এই জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ পথ শিশু কিংবা শিশুশ্রম এ যুক্ত। এইসকল শিশুরা কর্মক্ষেত্রে কিংবা রাস্তা ঘাটে নানা ভাবে হয় নির্যাতন এর শিকার। সম্প্রতি রাজধনীর শাহবাগ মেট্রোস্টেশন এর নিচে এক পথশিশুকে ধর্ষণ এর অভিযোগ উঠেছে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতি ১০ জন পথশিশুর মধ্যে ৮ জনই পথচারীদের দ্বারা নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়ে গেছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মহামারির সময় বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে চারজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এর সহায়তায় করা একটি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশ এ শিশু যৌন নির্যাতন এর হার ৩.৩-৪১.৫ শতাংশ। এবং মেয়ে শিশুর সবচেয়ে বেশি নির্যাতন এর শিকার হয়। বাংলাদেশ সরকার এর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এর ২০০৫ সালে তৈরি করা একটি রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ এ সেই বছর শিশু যৌন নির্যাতন এর সংখ্যা ছিল ৫৫৫ পরবর্তী তে ২০১০ সালে যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৫৪২ এ।
মানসিক স্বাস্থ্যে উপর প্রভাব:
যৌন নির্যাতন সমাজের নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। যার প্রভাব কোমলমতি শিশুদের উপর দীর্ঘসময়ের এমনকি পুরো জীবন অনেক ক্ষেত্রে বয়ে বেড়াতে হতে পারে এর প্রভাব।এর আঘাত শুধু শরীর এর নয়, মনেরও।
মানসিক সমস্যার মধ্যে হতে পারে আচরণগত সমস্যা, উদ্বেগ, বিষন্নতা এমনকি Acute Stress Disorder (ASD),Post Traumatic Stress Disorder (PTSD),Adjustment disorder এর মতো মানসিক সমস্যা ও হতে পারে। যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুরা প্রায়ই পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে (PTSD) ভোগেন। এর ফলে তারা বারবার সেই ঘটনা মনে করতে পারেন, দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন, বা ছোট ছোট বিষয়েও আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। এমনকি ই ট্রমা শিশুর স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠাতেও ব্যাঘাত ঘটায়। অনেক শিশু স্কুল ছেড়ে দেয় এবং নিজেকে এক ঘরে করে ফেলে।ভুক্তভোগীরা প্রায়ই স্থায়ী উদ্বেগের শিকার হন। তারা মানুষের সংস্পর্শে আসতে ভয় পায়, অপ্রত্যাশিত শব্দ বা স্পর্শে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে সমস্যার সম্মুখীন হয়।অনেক নিপীড়নের শিকার শিশু মানসিক যন্ত্রণার কারণে আত্মঘাতী চিন্তা বা আত্মহানির প্রচেষ্টা করেন। অপরাধবোধ, একাকীত্ব, এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুভূতি তাদের এই পথে ঠেলে দেয়। শিশুরা নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভয় পায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি পরবর্তী জীবনে যেকোনো শারীরিক সম্পর্ক তৈরিতে বাঁধা সৃষ্টি করে। এটিকে যৌন সঙ্গমে অনীহা বা Sexual Dysfunction বলে। এই ধরনের ট্রমাটিক ইভেন্ট এ শিশু সাধারণত শুরুতে বুঝতে পারেনা কি ঘটেছে তার সাথে, তাই ব্রেন ঘটনাটি প্রসেস করতে চায় যার ফলে শিশুদের মাঝে অতিরিক্ত আবেগ যেমন রাগ, দুঃখ , ভয় দেখা যায়।যা পরবর্তীতে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। যেমন: ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে উঠে পড়া, এমন কোনো কিছু যা সেই এক্সপেরিয়েন্স কে মনে করিয়ে দেয় সেগুলো দেখলে হটাৎ ঘাবড়ে যাওয়া ইত্যাদি। আবার Adjustment disorder এর ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশু যেকোনো পরিস্থিতে স্বাভাবিক এর থেকে ভিন্ন রিঅ্যাকশন দেয়। এটি মূলত হয় আচরণগত এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া গুলোকে স্বাভাবিক এর থেকে তীব্র ভাবে প্রকাশ করে। যা মানসিক যন্ত্রণা, চাপ এর কারণে মূলত শিশু এই ধরনের আচরণ করে।এগুলো ছাড়াও শিশুর স্বাভাবিক জীবন যাপন বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক শিশু নিজেকে এর পিছনে দায়ী বলে মনে করে এবং মানসিক হীনমন্যতায় ভুগে।
প্রতিরোধ এবং প্রতিকার:
যৌন নিপীড়ন এর মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রথমত আইন এবং শাস্তির আওতায় এনে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এবং ভুক্তভুগি কে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া। এই ধরনের ঘটনায় শারীরিক স্বাস্থ্য কে যেমন প্রাধান্য দেওয়া হয় মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে তেমন গুরুত্ব না দিলে কোনোদিনই ভিক্টিম কে ট্রমা থেকে বের করে আনা সম্ভব না। তাই যৌন নিপীড়ন এর শিকার শিশুকে অবশ্যই প্রপার কাউন্সেলিং এর প্রয়োজন। তাই অবশ্যই শারীরিক স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলেই কাছাকাছি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এর শরণাপন্ন হতে হবে। এবং কাউন্সেলিং এর প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কাউন্সেলিং থেকে অব্যাহতি নেওয়া যাবে না। প্যানিক অ্যাটাক এবং অন্য মানসিক সমস্যারক্ষেত্রে ডাক্তার যেসকল মেডিসিন নেওয়ার পরামর্শ দিবেন সেগুলো ডাক্তারের পরামর্শ অনুয়ায়ী গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশে এই ধরনের ঘটনায় ভিক্টিম ব্লেমিং করা হয় অনেক ক্ষেত্রে। ফলে ভুক্তভুগি মানসিক ভাবে আরো ভেঙে পড়ে। তাই পরিবার ও সমাজ কে সচেতন থাকতে হবে। এমন কোনো কিছুই তাদের সামনে বলা যাবেনা যা তাদের ট্রমা কে ট্রিগার করে।পরিবার, বন্ধু, ও সমাজের সহানুভূতিশীল আচরণ ভুক্তভোগীর মানসিক পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। এছাড়াও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি।
যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণ শিশু কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক সকলের জন্য শারীরিক ,মানসিক উভয়দিকেই ক্ষতিকর। চলুন এসব এর বিরুদ্ধে আরো সোচ্চার হই। মানসিক স্বাস্থ্য কে গুরুত্ব দেই আরো জোরালো ভাবে। সুস্থ্য মানসিক অবস্থা জীবনের সকল ক্ষেত্রে সফল হতে ভূমিকা রাখে।
