“পরীক্ষা” শব্দটি আমাদের নিত্যদিনের শোনা। শুনতে খুব সাধারন শব্দ হলেও ছাত্রদের থেকে শুরু করে পেশাদারদের কাছে এ যেন এক আতঙ্কের নাম। পরীক্ষা নিকটে আসলেই নার্ভাসনেস,অস্বস্তি,মাথা ব্যথা সব যেন একত্রে চেপে বসে। কিন্তু কেন এ ভয়? ভীতির কারণ প্রত্যেক মানুষের কাছে ভিন্ন রকম হতে পারে। কেউ হয়তো তার স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়ে যাবে সেই জন্য ভয় পেয়ে থাকেন , কেউ হয়তো বা পরি পূর্ণতাবাদে আসক্ত, কেউ হয়তো ভয় পাচ্ছে পরিবারের ভালো রেজাল্ট আশা করার চাপের কারণে, কেউ হয়তো আগে খারাপ অভিজ্ঞতার কারণে ভয় পেয়ে থাকে। বিষয়গুলো খুব সাধারণ লাগলেও একটু সামান্য পরীক্ষাভীতির কারণে অনেক সময় ভালো প্রিপারেশন নেওয়া পরীক্ষাগুলোও খারাপ হয়ে যায়। কেউ হয়তোবা প্রচন্ড টেনশনে পরীক্ষার আগের রাতে ঠিকমত রিভাইস করতে পারে না। কেউ হয়তোবা নার্ভাসনেস এর কারনে পরীক্ষার হলে জানা প্রশ্ন গুলোও ভুলে যায়। তাহলে এ ভয়কে জয় করার উপায় কি ? তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে পরীক্ষা ভীতি কে বাগে আনব? কিভাবে পরীক্ষার ফলাফলের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিব এবং নিজের মানসিক সুস্থতাকে বজায় রাখবো।
ভালো প্রিপারেশন: পর্যাপ্ত প্রিপারেশন ভয় কমানোর এক অনন্য হাতিয়ার। প্রথমেই আপনার পরীক্ষার ডেট মার্ক করুন। তারপর পরিপূর্ণ একটি রোড ম্যাপ তৈরি করুন কিভাবে এ মধ্যবর্তী সময় আপনার সবগুলো পড়া যথাসময় শেষ করবেন। রিভিশনের জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখুন এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত অনুশীলনের মধ্যে রাখুন। যদি আপনার প্রিপারেশন ভালো হয় তাহলে সহজেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন। আর এই আত্মবিশ্বাসই ভয়কে মিটিয়ে দিতে পারে।
হেলদি লাইফ স্টাইল: পরীক্ষা আসলেই কেন যেন আমরা আমাদের লাইফস্টাইলটাকে পরিবর্তন করে ফেলি। আমাদের খাওয়া দাওয়া এবং ঘুম দুটোই হারাম হয়ে যায়। যা আমাদের পরীক্ষার উপর খুবই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের প্রতি লক্ষ্য দেওয়া উচিত কেননা একটি হেলদি লাইফ স্টাইল আপনার ব্রেনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং মানসিক চাপ অনেকাংশে কমায়।
রিলাক্সেশন এন্ড মেডিটেশন: রিলাক্সেশন এন্ড মেডিটেশন আপনার মন এবং শরীরকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে, উদ্বেগ কমাতে পারে । ইন্টারনেট থাকলেই মেডিটেশনের অনেক মেথড আপনি পেয়ে যাবেন ,সেগুলো একটু ট্রাই করে দেখতে পারেন অথবা আমাদের প্রত্যেক ধর্মেই নিজস্ব কিছু মেডিটেশনাল রিচুয়াল থাকে,মুসলিমদের ক্ষেত্রে যেমন নামাজ,কেননা নামাজ তাদের আত্মাকে প্রশান্তি দেয় এবং তারা দৈনন্দিন কাজে আরো মনোযোগ দিতে পারে (বিস্তারিত জানতে প্রোডাক্টিভ মুসলিম বইটি পড়তে পারেন) তাই আপনারা যার যার ধর্মীয় আচারগুলো নিজের জীবনে খাটিয়ে দেখতে পারেন।
পজিটিভিটি: পজেটিভ চিন্তা মানুষের অনেক চাপই কমিয়ে দিতে পারে। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক – আমরা অনেক সময় মানুষের গাড়ি বাড়ি টাকা পয়সা দেখে হতাশায় ভুগি যে কেন আমাদের এগুলো নেই. কিন্তু যখনই আমরা পথে ঘাটে কোনো মানুষদের দেখি যাদের হাত নেই , পা নেই , চোখ নেই তখনই আমাদের মনের ভেতর হুট করে হতাশা চলে যায় কেননা আমরা তাদের থেকে ভালো আছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করি।
রেজাল্ট কিভাবে মেনে নিবঃ
এক্সপেক্টেশন নিয়ন্ত্রণ: একটি পরীক্ষা আপনাকে কিংবা আপনার বুদ্ধিমত্তাকে প্রকাশ করতে পারে না বরং পরীক্ষাটি আপনার নির্দিষ্ট সময়ের কার্যক্ষমতার একটি প্রতিফলন। একটি গ্রোথ মেন্টালিটি অবলম্বন করুন এবং ব্যর্থতাকে বৃদ্ধি ও শেখার সুযোগ হিসাবে বিবেচনা করুন।
ইমোশন নিয়ন্ত্রণ: আপনার ফলাফলে আপনার যা অনুভূত হয় তা অনুভব করার চেষ্টা করুন হোক সেটা হতাশার কিংবা আনন্দের। আবেগকে দমন করা,কষ্ট কে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। আপনি যে ন ফিল করছেন তা আপনার কোন নিকট আত্মীয় অথবা আপনার বন্ধু-বান্ধবের সাথে শেয়ার করুন।
পরবর্তী ধাপে ফোকাস: একটি পরীক্ষাই জীবনের সবকিছু নয় এবং কখনো হবেও না। তাই একটি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে হতাশায় মগ্ন না থেকে পরবর্তী ধাপে নজর দিন। বোর্ড পরীক্ষা হলে পরবর্তী কোন বোর্ড পরীক্ষা, এডমিশন টেস্ট হলে অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার দিকে ফোকাস করুন এবং এ পরীক্ষায় যে ভুলগুলো হয়েছে সেগুলো যাতে সামনে না হয় তার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নেন।
সাপোর্টিং ব্যক্তি নির্বাচন : আপনার ফলাফলগুলোকে সহায়ক পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা পরামর্শদাতাদের সাথে শেয়ার করুন যারা উৎসাহ এবং গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া প্রদান করবেন। এমন ব্যক্তিদের এড়িয়ে চলুন যারা আপনাকে কঠোরভাবে বিচার বা সমালোচনা করতে পারে । আপনার পরীক্ষার ব্যাপারে সহায়ক কোন পরিবার সদস্য বা বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরামর্শ দাতার সাথে আলোচনা করুন যারা আপনাকে উৎসাহ এবং গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া প্রদান করবে।
রেজাল্ট মেনে নেওয়ার ফলে নিজের ভুল শোধরানোর দরজা খুলে যায়। নিজের জীবনযাপনকে প্রশ্ন করতেই হয় এবং এতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দিক গুলো বের হয়ে আসে। তবে এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাড়াতে পারে নিজের অহংকার। বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া অবশ্যই কঠিন তবে মনে রাখতে হবে, পরবর্তীতে সফল হতে হলে এখনি সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। প্রশাসন এবং শিক্ষা ব্যাবস্থার উপর প্রশ্ন তোলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ন তবে তা হতে হবে নিজস্ব ত্রুটি মেনে নেওয়ার পর।
অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ: পরীক্ষার ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করার সময় আপনার অনূভুতিগুলোকে খোলামেলা ও সততার সাথে প্রকাশ করুন। এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার চিন্তা, উদ্বেগ এবং পরিকল্পনা প্রকাশ করুন। প্রয়োজনে পরামর্শ নিন তবে শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নিন যা আপনার লক্ষ্য এবং মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হতাশা থেকে বেড়িয়ে আসাঃ
সংযুক্ত থাকুন: আমরা পরীক্ষা খারাপ করলে ঘর বন্দি হয়ে বসে থাকি কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ করি না, কোথাও ঘুরতে যাই না, খেলাধুলা করি না যা আমাদেরকে আরো হতাশায় ফেলে দেয়। বন্ধু,পরিবার এবং সাথে সামাজিক সংযোগ বজায় রাখুন। এমন ক্রিয়াকলাপগুলোতে জড়িত হন যা আপনাকে আনন্দ এবং পরিপূর্ণতা দেয়, তা শখ, খেলাধুলা বা স্বেচ্ছাসেবীতা হোক।
প্রফেশনাল হেল্প: হতাশা যদি চরম পর্যায়ে চলে যায় তাহলে আপনি একটি মানসিক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন.
সৃষ্টি কর্তাকে ডাকা: আমাদের প্রত্যেক ধর্মেই হতাশাকে মোকাবেলা করার অজস্র পথ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেক ধর্মেই হতাশা মোকাবেলা, বিষন্নতাকে কাটিয়ে ওঠা ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা থাকে
পরিশেষে বলা যায়, পরীক্ষাভীতির চ্যালেঞ্জকে কার্যকরী কৌশলের মাধ্যমে পরিচালনা করা যেতে পারে। অধ্যাবসায়ের সাথে প্রস্তুতি নেওয়া, ইতিবাচক ধারণা, ও দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার ভয় কাটিয়ে উঠতে পারে। মনে রাখবেন একটি পরীক্ষা আপনার জীবনকে প্রতিফলিত করতে পারে না, সব সময় সাফল্যই আসবে তা নয়। সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়েই মানব জীবন। ব্যর্থতা আসবে তাই বলে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। উঠে দাঁড়িয়ে তাকে মোকাবেলা করে তার পরবর্তী ধাপকে জয় করতে হবে। আর মনে রাখবেন একাডেমিক জীবনকে মূল্যায়ন করতে করতে আমরা যেন সুস্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতে না ভুলি।
References:
এম. ডি. মাহিন
স্বাস্থ্য অর্থনীতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
