মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতা  

মাতৃত্ব একজন নারীর জীবনে অনেক বড়পরিবর্তন আনে গর্ভকালীন সময়কে অতিক্রম করে একজন মায়েরদীর্ঘ কাঙ্খিত সুখ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় কিন্তু এই সুখ সহজেআসে না কারণ নারীদের একাধিক শারীরিক মানসিক সমস্যা পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয় এই সময়ের একটি বড় অংশহল মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতা 

 মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতাপুরো মাতৃত্বকালকে কঠিন করে তোলে। গর্ভাবস্থায় শারীরিক ও মানসিক জটিলতার কারণে সৃষ্ট মানসিকঅবস্থা গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবোত্তর এক বছর পর্যন্তনারীদের প্রভাবিত করতে পারেমাতৃত্বকালীন বিষণ্নতা বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১২১ মিলিয়ননারীকে প্রভাবিত করেগর্ভাবস্থায় মায়ের বিষণ্ণতা সন্তানের জন্যওক্ষতিকরগর্ভাবস্হায় শারীরিক এবং মানসিক চাপ হতাশার প্রধান কারণ।এছাড়াদীর্ঘস্থায়ী দুঃখ, দুশ্চিন্তা, হতাশার অনুভূতি, মূল্যহীনতার অনুভূতি, অসহায়ত্ব, শক্তি হ্রাস 

ঘুমের অসুবিধা এগুলি মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতারঅন্যতম লক্ষণঅতিরিক্ত রাগের অনুভূতি এবং শিশুর সঠিক যত্ন নেওয়ারক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করাও মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতার লক্ষণ।   

 

বিষণ্ণতার এই পরিস্থিতির জন্য পারিপার্শ্বিকতা দায়ীকখনও কখনওনারীরা মাতৃত্বকালীন জীবনে আসন্ন পরিবর্তনের জন্য ভীত এবংহতাশ হয়ে পড়েনশারীরিক অসুবিধার জন্য গর্ভবতী নারীরামানসিকভাবে ক্লান্তি অনুভব করেন। ৬.৫% থেকে ২০% নারীপ্রসবোত্তর বিষণ্নতায় ভোগেনবাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে, মাতৃত্বকালীনহতাশার হার ৫৭.১%। হতাশার কারণগুলো হলো:-  

 

  • মায়েদের মধ্যে আসন্ন ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য ভীতি হতাশার সৃষ্টি হয় গর্ভাবস্থায় নারীর খুশি থাকা দরকার কিন্তু তাদেরচারপাশের পরিস্থিতি কখনো কখনো এমন ভালো থাকাকে বাধাগ্রস্ত করে বেশির ভাগ সময়, তারা তার আশেপাশের যেই উপযুক্তপরিবেশটা আশা করে, তেমনটা পায় নাস্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণপরিবেশের অভাবে নারীদের মানসিক স্থিতিশীলতা কমে যায়গর্ভাবস্থায় পারিবারিক সহিংসতা মানসিক চাপের আরেকটিসুনির্দিষ্ট কারণ যার হার . থেকে ২৭.% 

 

  • সারাবিশ্বে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন নারী মাতৃত্বকালীন বিষণ্ণতায় ভুগেন গর্ভাবস্থায় শারীরিক, সামাজিক এবং মানসিকপরিবর্তনের সংমিশ্রণ মানসিক বিষণ্নতা এবং উদ্বেগের কারণয়ে দাড়ায় 

 

  • কখনও কখনও পূর্ব মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াই অনেকে গর্ভধারণ করেন গর্ভাবস্থার শুরুতেহঠাৎ করে জীবনের পরিবর্তন মেনে নিতে পারেন না অনেকনারী প্রায় ২৯% গর্ভধারণ অনিচ্ছাকৃত অসাবধানতারবশে ঘটে থাকে 
  • প্রত্যেক নারীই চায় গর্ভকালীন সময় তাদের জীবনসঙ্গী যেন তার সাথেভালো সময় কাটায় কিন্তু কোনোভাবে তা সম্ভব না হলেগর্ভবতী নারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন 

 

  • সন্তান জন্মের পর সন্তানের লালনপালন প্রতিটি মায়ের জন্যনতুন মানসিক সংগ্রামের কারণ হয়ে ওঠে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দীর্ঘ সময় গর্ভকালীন শারীরিক মানসিক চাপের পর একজন নারী শারীরিক মানসিক ভাবে ক্লান্তহয়ে পড়েন এই শারীরিক চাপের পরে একজন নারীর যথাযথ বিশ্রামপ্রয়োজন কিন্তু তারা সঠিক বিশ্রাম, ঘুমের জন্য পর্যাপ্তসময়, তাদের প্রয়োজনীয় সঠিক পুষ্টি পায় না বরং তাদেরনতুন জন্ম নেওয়া শিশুর যত্ন নেওয়ার জন্য তাদের আরও বেশিপরিশ্রম করতে হয়, যদিও অনেক সময় তাদের সেই পরিমানশারীরিক বা মানসিক সক্ষমতা থাকে না যে কারণে নারীরাহতাশ হয়ে পড়েন 
  • ুরুতরভাবে হতাশাগ্রস্ত হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলবড় এক বা একাধিক সন্তান থাকা কারণ নবজাতক সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে মা সঠিকভাবে তার অন্য সন্তানদের সাথে সময় কাটাতে সঠিক যত্ন নিতে পারেন এটা মাকে খুব কষ্ট দেয় 

 

  • কর্জীবী নারীদের হতাশার সৃষ্টি হতে পারে যদি তারা তাদেরকর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশ না পায় 

 

নবজাতক সন্তানের সাথে সাথে প্রতিটি নতুন মায়ের প্রসবকালীনধকল কাটিয়ে উঠতে যথাযথ যত্ন এবং সহায়তার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ৮০% নারী পরিবারের কাছ থেকে সেই মানসিক সাহসএবং যথাযথ সহায়তা পায় না।বিশেষত গ্রামীণ এলাকারবেশিরভাগ নারীরা এধরনে সহায়তা থেকে বঞ্চিত৷ গর্ভাবস্থার পুরোসময় এবং মা হওয়ার পর প্রতিটি পর্যায়ে, প্রতিটিনারীর যথাযথ যত্ন এবং মানসিক পরিচর্যা প্রয়োজন যা তাদের স্বস্তিদিতে পারে৷ মাতৃত্বকালীন মানসিক সমস্যাগুলো চিকিৎসাযোগ্য এবং যথাযথসহায়তা পেলে প্রতিরোধ করা সম্ভবমাতৃত্বকালীনমানসিক যত্ন নিশ্চিত করতে স্বামী পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণভূমিকা পালন করতে পারে তাদের করণীয়গুলো নিম্নরূপ 

 

  • গর্ভকালীন প্রসবোত্তর সময়ে স্বামী এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়ক 

এবংসহযোগিতামূলক আচরণ দেখাতে হবে প্রসবোত্তর মনোব্যাধি মোকাবেলা করার জন্য পরিবারের কাছথেকে সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ১০ থেকে ২০% নতুন মাপ্রসবোত্তর বিষণ্নতা অনুভব করেন 

 

  • ্রত্যেক নতুন মাকে ইতিবাচক চিন্তার সাথে জড়িত থাকতে উৎসাহিত করতে হবে 

 

  • রিবারের সদস্যদের উচিত নারীদের মানসিক ভাবে শক্তথাকতে অনুপ্রাণিত করা তাদে সাথে সময় কাটানোযাতে নারীরা নির্দ্বিধায় তার মানসিক এবং শারীরিক কষ্টগুলো খুলে বলতে পারে 

 

  • স্বামী এবং পরিবারের সদস্যদেরঅন্যান্য বড় সন্তানদের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিতযাতে অন্য সন্তানের কথা চিন্তা করে নারীকে অতিরিক্তমানসিক চাপ নিতে না হয় 

 

  • কর্মজীবী মায়ের মানসিক চাপের বিষয়ে পরিবারের সদস্যদেরসচেতন সহায়তাপূর্ণ হওয়া উচিত 

 

  • মানসিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কপরামর্শ মানসিক যন্ত্রণা উপশমের জন্যস্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেনে চলা একজন নারীর মাতৃত্বকালীনসময়কে সাবলীল করে তুলতে সক্ষম প্রয়োজনে কাউন্সিলিং সেবা নেওয়া যেতে পারেএক্ষেত্রে একজন ডাক্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।  

 

মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ  

অধ্যায় নারীদেরএই মাতৃত্বকাল সুন্দর ও মানসিক চাপমুক্ত থাকবে এটাইকাম্যসকলকে সচেতন থাকতে হবে যেন মানসিক বিষণ্নতা নারীরজীবনের অন্যতম সুন্দর মুহুর্তগুলোর জন্য বিপজ্জনক না হয়ে ওঠে পরিবারের সহযোগিতাপূর্ণ আচরণই নারীদের মাতৃত্বকালীন যাত্রাকে করতে পারে সহজ ও সুন্দর 

 

 

রেফারেন্স 

  1. জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইট 
  1. নিউ ইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথের ওয়েবসাইট 

 

নামঃ ছামিয়া মমতাজ অন্তি 

সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউট   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  

 

LEAVE REPLY

Your email address will not be published. Required fields are marked *