আমাদের সমাজে “পুরুষ” শব্দটি দ্বারা বোঝায় দায়িত্ববান, ক্ষমতাবান, সাহসী, কঠোর ইত্যাদি। এই শব্দগুলো দ্বারা আমাদের সমাজ পুরুষকে আর্থ-সামাজিকভাবে একটা উঁচু স্থানে রাখে। এইভাবে সমাজ নির্ধারণ করে দিয়েছে একজন পুরুষের আচরণগত বৈশিষ্ট্য কেমন হবে। “পুরুষদের কাঁদতে নেই” বা “Be a man!’ এসব কথাগুলো দ্বারা ছেলেদের কাঙ্খিত চাল-চলন, কথাবার্তা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
একজন পুরুষ নিজেকে সামাজিক কাঠামোর সংজ্ঞা অনুযায়ী পুরুষ প্রমাণ করতে গিয়ে নিজের অনুভূতি আবেগ নিজের মধ্যে চেপে রাখেন এবং একটা সময় এই কারণে দেখা যায় বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
মানসিক স্বাস্থ্য হলো আমাদের মন, আচরণগত ও আবেগপূর্ণ স্বাস্থ্যের দিকটি। যখন কোন ব্যক্তির আচরণ ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় বিশেষ করে আবেগীয় প্রকাশের পরিবর্তন আসে এবং সেটা তার দৈনন্দিন কর্মকান্ড এবং সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে তখন বুঝতে হবে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আছেন।
মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতনতা মানুষের মাঝে বাড়লেও, আজকের সময়ে আমাদের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় সবকিছু মানিয়ে নিতে গিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের যথাযথভাবে যত্ন নেওয়া হয়ে উঠে না। এজন্য আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেক বেশি অবহেলিত হয়।
মানুষের জীবনে দুঃখ আসবে হতাশা আসবে কষ্ট আসবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সাধারণত দেখা যায় নানা গণ্ডির মধ্যে আটকে সবার কাছে পুরুষ প্রমাণ করতে গিয়ে বেশিরভাগ পুরুষ নিজেদের মনের আবেগ প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে ভেতরে ভেতরে পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুকি বাড়তে থাকে।
আমাদের সমাজ পুরুষদের ওপর দিয়ে রেখেছে একটি অদৃশ্য প্রত্যাশার বোঝা।
সমাজ পুরুষকে স্রেফ সাহস ও শক্তির প্রতিচ্ছবি বানিয়ে দিয়ে তার উপর অনেক চাহিদার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। প্রথাগত লিঙ্গভিত্তিক এই ভূমিকা পালন করতে গিয়েই একজন ছেলে তার মানসিক সমস্যা নিয়ে সাহায্য চাইতে বা আবেগ বিষয়ে কথা বলতে চায় না।
গবেষণায় (Priory, 2024) দেখা গিয়েছে প্রতি ১০ জনে ৪ জন পুরুষ তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কখনো কথা বলেনি এবং সেখানে ২৯% পুরুষ বলেন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা তাদের জন্য বিব্রতকর। ২০% পুরুষ নিজের মানসিক অনুভূতি নেতিবাচক স্টিগমার কারণে কথা বলেন না। ১৭ % পুরুষ তাদের সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে না এবং ১৬% পুরুষ মনে করেন সে এই বিষয়ে কথা বললে তাকে দুর্বল ভাবা হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রতি ৮ জনে ১ জন পুরুষের মধ্যে নানা মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, যেখানে প্রতি ৫ জনে ১ জন নারী। নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সংকোচ এবং সামাজিক স্টিগমা, এসবের ফলে মানসিক স্বাস্থ্যে পুরুষদের নানা ঝুঁকি তৈরি হয়।
পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক স্টিগমা, প্রেমঘটিত সমস্যা , একাকীত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে ছেলেদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির জন্য বেড়ে চলেছে মেল ডিপ্রেশন। নারীদের তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশি ডিপ্রেশন দেখা যায়। হঠাৎ করে রেগে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ, অতিরিক্ত বিলুপ্তি প্রকাশ, আবেগে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ মেল ডিপ্রেশনের প্রাথমিক লক্ষণ। বেশিরভাগ পুরুষই মেল ইগোর কারণে বোঝেন না তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, নারীদের তুলনায় পুরুষরা সিজোফ্রেনিয়ায় বেশি ভুগছেন। ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের আত্মহত্যার হার অপেক্ষাকৃতভাবে বেশি।
ছেলেরা সাধারণত সামাজিক বৈষম্যের কারণে মানসিক অসুস্থতা গোপন করে রাখে। ফলে তারা হয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অথবা অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে। আবার অনেকে এসব মানসিক অবক্ষয়ের থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা বেছে নিচ্ছে নানা রকম অনৈতিক পথ যেমন, মাদকাসক্তি, হিংস্রতা, অপরাধপ্রবণতা , প্রতিশোধ প্রবণতা ইত্যাদি।
তাই মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে ছেলেদের নিজেদেরই কিছু বিষয় চর্চার মধ্যে নিতে হবে
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
- নিয়মিত শরীরচর্চা ও মেডিটেশন চর্চা করা
- ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব গড়ে তোলা
- দৈনিক কাজের পাশাপাশি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িত রাখা
- ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসন মেনে চলা ও সহানুভূতিশীল হওয়া
এছাড়া নিজের ছেলের মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সচেতনতা জরুরী। ছেলে বলে তার ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা না চাপিয়ে দিয়ে তার মানসিক সামর্থ্য ও আবেগকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজের সদস্যদেরকে নিশ্চিত করতে হবে একজন ছেলে মানুষ স্কুলে বা অন্য কোথাও বুলিং, শারীরিক নিপীড়ন বা যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে কিনা। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব না ঢুকিয়ে ছেলে শিশুর মনে মনুষত্ববোধ তৈরি করতে হবে।
আমাদের সমাজে পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সবচেয়ে বড় বাধা হলো সামাজিক স্টিগমা ও বৈষম্য। এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে । মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম গুলো কার্যকর করার মাধ্যমে ছেলেদের মধ্যে কাউন্সিলিং সেবা গ্রহণের সংকোচবোধ কমিয়ে আনতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খুলে কথা বলা যে দুর্বলতা নই এই বিষয়ে আত্ম উপলব্ধি করাতে হবে এবং এক্ষেত্রে ওপেন গ্রুপ থেরাপি বা Peer Support Group ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সাহায্য চাওয়া যে দুর্বলতা নাই বরং সাহসিকতা সে বিষয়ে ক্যাম্পেইন ও অন্যান্য কর্মশালার মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। এভাবে সামাজিক বৈষম্য ভেঙে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ আমরা নিশ্চিত করতে পারব।
রাফিদ রহমান
মনোবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
REFERENCES:
- BBC News বাংলা. (2019, October 10). মানসিক স্বাস্থ্য: যেসব লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ
নিবেন || BBC Bangla [Video]. YouTube. https://www.youtube.com/watch?v=VkqenjzfHQg
- Men’s Mental Health: Why 40% of men won’t talk about it. (2024, October 23). Priory. https://www.priorygroup.com/blog/40-of-men-wont-talk-to-anyone-about-their-mental-health
- আখতার. মা. (2024, March 28). উপেক্ষিত ছেলেদের মানসিক স্বাস্থ্য. Shampratik Deshkal.
https://shampratikdeshkal.com/lifestyle/news/2403140691/উপেক্ষিত-ছেলেদের-মানসিক-স্বাস্থ্য
- চৌধুরী. আ. (2023, December 23). পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবহেলা নয়, জেনে নিন করণীয়. The Daily Star Bangla. https://bangla.thedailystar.net/life-living/wellness/news-541871
