কল্পনার জগতে বাস কখন অসুস্থতায় পরিণত হয়?

মানব মন কল্পনার এক বিশাল আস্তানা।প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নানান ভাবনা সর্বদাই আমাদের মনকে জাগিয়ে রাখে।কিন্তু এই ভাবনা যদি হয় কাল্পনিক কোনো বস্তু বা অস্তিত্বকে নিয়ে আর সেটা যদি দিনদিন বেড়েই চলে তখনই ঘটে বিপত্তি। সেটা কিরকম?চলুন জেনে নেওয়া যাক কল্পনার জগতে বাস করা বলতে আসলে কি বুঝি আমরা, ধারণাটা কি ভুল নাকি সত্যিই এরকমটা হয়,যদি হয় তাহলে সেটা কি কি কারণে হয় এবং এটি মানবজীবনের স্বাভাবিক কাজকর্মে কোনো প্রভাব ফেলে কিনা আর এর থেকে পরিত্রাণের উপায়সমূহ।

 

‘কল্পনার জগতে বাস’ ধারণাটি আসলে কেমন?

 

‘কল্পনার জগতে বাস’ কথাটা শুনলেই কিছু প্রকল্পিত বা অনুমিত ধারণা মস্তিষ্কে দানা বাঁধে না!হ্যাঁ,অতিরিক্ত পরিমাণে যখন কেউ কল্পনায় ডুবে থাকে তখন সেটাকে ক্ষতিকর মানসিক সমস্যা বা রোগ হিসেবেই ধরা হয়,আর ইংরেজি পরিভাষায় সেটিকে বলা হয় ম্যালএডাপটিভ ডে-ড্রিমিং বা ক্ষতিকর দিবাস্বপ্ন।

আবার এটিকে সেরকম অর্থে মানসিক রোগও বলা যায় না, কারণ মানব মন ভাববে চিন্তা করবে এটাই স্বাভাবিক।সর্বপ্রথম ২০০২ সালে ইউনিভার্সিটি অব হাইফার গবেষক এলি সোমার ধারণাটির ব্যাখ্যা দেন এবং বলেন, “এটি অতিরিক্ত বা উদ্ভট কল্পনা যা মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম বা ইন্টারেকশনে বাঁধার সৃষ্টি করে এবং একাডেমিক, আন্তব্যাক্তিক অথবা কারিগরি ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে।” সোমারের গবেষণায়ও কিছু ত্রুটি ছিলো, কারণ এখানে কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট ছিলো না।আদতে ‘কল্পনার জগতে বাস’ এটি একটি অদৃশ্য ধারণা, না দেখা যায়, না ছোঁয়া যায়।শুধু যার সাথে ঘটে সে-ই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবে, কিন্তু অপরদিকের কোনো মানুষকে সেই বিষয়টি বোঝাতে গেলেই ঘটে বিপত্তি। কেউ কেউ তো আবার মানসিক রোগী বলে আখ্যায়িত করে দেয় অনায়াসেই।

 

এবার দেখা যাক ঠিক কী কী কারণে এটিকে মানসিক রোগ হিসেবে ধরা হয়-

 

মানুষ ভাবতে ভাবতে ভাবনায় এতটাই মশগুল হয়ে যায় যে কতটুকু ভাবা দরকার বা চিন্তার পরিধি কতটুকু সেটা অনুধাবন করার শক্তিটাই হারিয়ে ফেলে। বাস্তবতা থেকে দূরে গিয়ে কাল্পনিক একটা বিষয়কে নিয়ে এতটাই মশগুল থাকে যে কি করা উচিত বা আশেপাশের মানুষ কি বলছে, কি চায় সেটা বোঝার ক্ষমতা তখন আর থাকে না।অনেকগুলো কারণ রয়েছে।তার মধ্যে-

 

১. এটেনশন ডেফিসিট হাইপারএক্টিভিটি ডিসওর্ডার (এডিএইচডি)

২.হতাশা

৩.কোনো কিছু নিয়ে তীব্র ভয় পাওয়া বা কোনো কিছুর মায়া থেকে বের হতে না পারা

৪.ওসিডি বা শুচিবায়ু সমস্যা

এমনকি বয়সের কারণেও এরকমটা হতে পারে। সমস্যাগুলো একটি অন্যটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

 

কল্পনার জগতে ডুবে থাকার প্রভাব:

 

বাস্তবতাবিবর্জিত কোনো চিন্তা ভাবনাই সুখকর হয়না।ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন প্রতিটি ক্ষেত্রেই কল্পনার প্রভাব রয়েছে।আর অতিরিক্ত পরিমাণে কিছু নিয়ে চিন্তা করলে তা একসময় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে।যেমন:

 

১.উদাসীনতা:মানব মনে অতিরিক্ত পরিমাণে কোনো বিষয় যখন দোলা দেয় তখন একধরনের অন্যমনস্কতা বা উদাসীনতা দেখা দেয়।তখন চারপাশের মানুষের কথায় বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আর মনোযোগ দিতে পারে না। এতে করে ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক জীবনে নানান সমস্যা দেখা দেয়।অনেকসময় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও তিক্ততার রূপ নেয়।

 

২.ক্যারিয়ারের উপর বিরূপ প্রভাব:অতিরিক্ত অন্যমনস্কতা চাকরি বা কাজের ক্ষেত্রে নানান সমস্যার সৃষ্টি করে।পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে চাকরি হারানোর মতো ঘটনাও ঘটে।

 

৩.সামাজিক সম্পর্কের অবনতি:মানুষ সামাজিক জীব।সমাজের মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকাটাই মানুষের ধর্ম। কিন্তু উদাসীনতা বা কল্পনার কারণে সমাজের মানুষের সাথে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে এবং একসময় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।বেশি বাড়াবাড়ি হলে এটি শত্রুতা কিংবা অনুচিত কোনো কাজে রূপ নেয়।

এছাড়াও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাসহ আরো অনেক সমস্যা দেখা দেয়।

 

এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায়সমূহ:

 

১. বাস্তবতার মাঝে সুখ খোঁজা:অতিরিক্ত পরিমাণে কল্পনার জগতে থাকতে থাকতে মানুষ একসময় বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যায়।কল্পনা থেকে বেরিয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলে চারপাশের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে,আনন্দ খুঁজে নিতে হবে।এজন্য ভ্রমণে যাওয়া, গল্পগুজব করা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কাজগুলো করা যেতে পারে।

২. পরিমিত পরিমাণে ঘুম:দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হলে ঘুম বা বিশ্রামের কোনো বিকল্প নেই।দৈনিক ৭-৮ঘন্টা ঘুম-ই পারে শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করতে।কল্পনার জগত থেকে বের হতে হলে স্নায়ুর যত্ন নিতে হবে, আর তা সম্ভব একমাত্র ঘুমের মাধ্যমে।

৩. নিজেকে সাপোর্ট দেয়া:অনেক সময় রিলেশনশিপে সফল না হওয়া,বিয়ে ভেঙে যাওয়া এসব কারণেও হতাশার জন্ম নেয়,আর তা থেকে সৃষ্টি হয় দুশ্চিন্তা,দিবাস্বপ্ন ইত্যাদি। এক্ষেত্রে নিজেকে বুঝানো, নিজেকে মোটিভেট করা এমনকি নিজেকে নিজের বন্ধু বানানো অপরিহার্য।

৪. দিনেরবেলায় ক্লান্তিভাব হ্রাস করাঃ বিশেষ করে সকালে প্রাকৃতিক সূর্যালোকে নিজেকে উন্মুক্ত করা জরুরি। ক্লান্তিভাব কমানোর জন্য ক্যাফিন খাওয়ার কথা বিবেচনা করুন, তবে প্রতিদিন 400 মিলিগ্রামের বেশি খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে এবং ঘুমানোর কমপক্ষে ৬ ঘন্টা আগে আপনার শেষ কাপ কফির সময় নির্ধারণ করতে হবে।

৫. কাছের মানুষদের সাথে আলোচনা করা;সাপোর্ট চাওয়াঃ  বিশ্বস্থ এমন লোকেদের কাছে লক্ষণগুলি ব্যাখ্যা করতে হবে, যেমন পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুরা৷ এটি দিবাস্বপ্নগুলিকে সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে যখন এই লোকেরা লক্ষণগুলি লক্ষ্য করলে আপনাকে বাধা দিয়ে সাহায্য করতে সক্ষম করবে।

 

ডাক্তাররা কিভাবে ম্যালাডাপ্টিভ ডেড্রিমিং সনাক্ত করেন- যেহেতু খারাপ দিবাস্বপ্ন দেখা একটি অফিসিয়ালি স্বীকৃত ব্যাধি নয়, তাই ডাক্তারদের সরাসরি এটি পরীক্ষা করার কোন উপায় নেই। কিন্তু ডাক্তাররা প্রশ্নাবলী এবং ADHD, OCDA, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং বিচ্ছিন্নতাজনিত ব্যাধিগুলির জন্য ব্যবহার করা অন্যান্য সরঞ্জামের সাহায্যে অস্বাভাবিক দিবাস্বপ্ন দেখার লক্ষণগুলি সন্ধান করতে পারেন।

 

ডাক্তাররা কীভাবে চিকিৎসা দেন- অস্বাভাবিক দিবাস্বপ্ন দেখার জন্য কোন আদর্শ চিকিৎসা নেই। কিন্তু ডাক্তাররা দেখেছেন যে তারা একই ধরনের অবস্থার জন্য অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবহার করতে পারেন যাতে খারাপ দিবাস্বপ্ন দেখা কমে যায়।

 

ম্যালএডাপটিভ ডে-ড্রিমিং এর প্রধান চিকিৎসা হল মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা (সাইকোথেরাপি)। কগনিটিভ বিহেভিয়ারেল থেরাপি (CBT) হল ওসিডি, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং বিচ্ছিন্নতাজনিত ব্যাধিগুলির মতো অবস্থার জন্য সবচেয়ে সাধারণ ধরণের থেরাপির একটি। CBT-এর পন্থা এমন লোকেদেরকেও সাহায্য করতে পারে যারা খারাপ দিবাস্বপ্ন দেখেন তারা কেন এটি করেন এবং এটি পরিচালনা করতে তারা কী করতে পারেন তা বুঝতে। মানসিক স্বাস্থ্য থেরাপির অন্যান্য রূপগুলিও কিছু সুবিধা দিতে পারে।

 

 

 

 

চারপাশের বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে করতে একসময় কল্পনার জগত থেকে কখন বের হয়ে গেলো ব্যক্তি সেটা টেরই পাবে না।আপাতদৃষ্টিতে মানসিক সমস্যাটির কোনো সমাধান না থাকলেও কিছু কিছু উপায় অবলম্বন করলে কল্পনার মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব।কাউন্সেলিং বা মেডিটেশন ছাড়াও থেরাপি প্রয়োগ করা হয় এসব ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে লক্ষণগুলির তীব্রতা বা পরিমাণ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হয়ে থাকে।

 

কল্পনায় ডুবে বাস্তবতাবিবর্জিত না হয়ে কল্পনার বিষয়গুলোকে বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারলেই জীবন সুন্দর।একটা মূলমন্ত্র হতে পারে-

 

“কল্পনা নয় আর, এসো বাস্তবতায়

বন্ধু হও নিজের,করো জীবনকে মহীয়ান”

 

 

References

 

https://www.sleepfoundation.org/mental-health/maladaptive-

 

https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/23336-maladaptive-daydreaming

 

https://www.webmd.com/mental-health/maladaptive-daydreaming

 

Written by:

Mahmuda Alam Niha

Samia Zaman

 

LEAVE REPLY

Your email address will not be published. Required fields are marked *