বিপিডি (BPD): কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা  

বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার যা সংক্ষেপে বিপিডি (BPD) নামে পরিচিত । এটি একই সাথে একটি বহুল আলোচিত পার্সোনালিটি (ব্যক্তিত্ব) ডিসঅর্ডার ও একটি মুড ডিসঅর্ডার। বিপিডি আক্রান্তদের অত্যাধিক মুড সুইং এর পাশাপাশি কোনো সম্পর্কে টিকে থাকতে সমস্যা হয় এবং তারা সহজে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ডিএসএম (DSM-5) এর তথ্য অনুযায়ী মোট ১০ ধরনের পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার আছে। এই ১০ টির মধ্যে বিপিডি একদম ইউনিক, কারন বিপিডি আক্রান্তদের আবেগিক অস্থিরতার তীব্রতা অন্য সব গুলোর থেকে বেশি হয়। 

 

মুড হল একজন মানুষের মনের একটি ক্ষণস্থায়ী অবস্থা। মুড ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত একজন ব্যক্তির মুড পরিবর্তন যেকোনো সুস্থ মানুষের মুড পরিবর্তন থেকে ভিন্নতর হয়ে থাকে। বিপিডি আক্রান্তদের খুব ঘন ঘন বা খুব দ্রুত মুড বদলে যায়, এবং এই বদলের পেছনে সবসময় বিশেষ কোনো কারণ লাগে না এবং এই মুড পরিবর্তনের  উপর তারা কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। 

পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতেও নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার মানসিক অসুস্থতার এমন একটি অবস্থা; যখন কোন মানুষের মনের চিন্তা ভাবনা বা ধ্যানধারণা এমন একটি কাঠামোতে গঠিত হয় যা কিনা তার মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্কের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মানুষটির দৈনন্দিন জীবনের আচার আচরণ সেই নির্দিষ্ট কাঠামোর উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়। 

 

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, একজন মানুষের পার্সোনালিটি তো জানি একটাই হয়, তাহলে এর আবার ঘন ঘন পরিবর্তন হওয়া কী করে সম্ভব! মনোবিজ্ঞানের ভাষায় পার্সোনালিটি হল; একজন মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি ও আচরণের সংমিশ্রণ ও মিথস্ক্রিয়ার ফলাফলে গঠিত একটি প্যাটার্ন। যেহেতু এটি একটি প্যাটার্ন তাই এর মধ্যে পরিবর্তনশীলতা থাকতেই পারে।  বিপিডি আক্রান্ত ব্যক্তির মুড ও পার্সোনালিটি  উভয়েরই হুটহাট পরিবর্তন দেখা যায়। 

 

কারা বিপিডি’র ভুক্তভোগী হতে পারে? 

 

বিপিডি’র চিহ্ন/লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকালে দেখা দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপিডি’র পরিষ্কার লক্ষণ দেখা যায় ২০ উর্ধ বয়সে। কিশোর-কিশোরীদের যখন বয়ঃসন্ধিকাল চলে তখন তাদের মস্তিষ্কের গঠনের পরিবর্তন চলমান থাকে, তাদের পরিপক্কতা তখন মাত্র শুরু হয়, তাই তাদের পার্সোনালিটির হঠাৎ পরিবর্তন হলেও তা বিপিডি বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। 

উপরন্তু ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত হরমোনের পরিবর্তন চলমান থাকে বলেও তাদের আচরণের প্যাটার্ন পরিবর্তিত হতে পারে। এমনকি ক্লিনিক্যাল ডায়াগনসিস করাতেও অনেক সময় অনূর্দ্ধ ১৮ বয়সীদের এক বছর পর্যবক্ষেণে রাখা হয়, তাদের আচরণের এ পরিবর্তনের পিছনের কারণ বিপিডি কিনা নিশ্চিত হতে। 

২০ উর্ধ তরুণ তরুণীরাই বিপিডি’র প্রধান ভুক্তভোগী। ডিএসএম(DSM-IV-TR) এর মতে বিপিডি’র নারী-পুরুষ অনুপাত হল ৩:১। ৭৫% বিপিডি ভুক্তভোগীই নারী এবং ২৫% হল পুরুষ। এই সমীক্ষা দেখে বিপিডি আক্রান্ত পুরুষদের অনুপাত কম মনে হতে পারে, তবে গবেষণায় উঠে এসেছে, পুরুষদের বিপিডি’র লক্ষণ যে প্যাটার্নে দেখা যায় তা অনেক সময়ই ডিপ্রেশন অথবা পিটিএসডি (PTSD) এর লক্ষণ মনে করে মিসডায়াগনোসড হয়ে থাকে। 

 

কেন/কীভাবে কারো বিপিডি হয়ে থাকে? 

 

বিপিডি ভুক্তভোগীদের যে শুধুমাত্র একটি কারণে বিপিডি হয় এমনটি কিন্তু না। দেখা যায় কয়েকটি কারণের সম্মিলিত প্রভাবেই বিপিডি হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কমন কারণ হল:- 

 

১। শৈশবের ট্রমা: কারো অতীতে ঘটা ট্রমার স্মৃতি থেকে পরবর্তীতে বিপিডি হতে পারে। পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শৈশবে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতন অথবা কোন প্যারেন্টস এর সাথে এটাচমেন্ট ইস্যু থেকেও বিপিডি হয়। ৭০% মানুষের বিপিডি আক্রান্ত হওয়ার পিছনে শৈশবের ট্রমার স্মৃতিই দায়ী। 

 

২। জিনগত কারনে: গবেষণায় দেখা গেছে ফ্যামিলির করো যদি বিপিডি এর হিস্ট্রি থেকে থাকে তবে ব্যক্তির বিপিডি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ডিএনএ/ জিনগত কারনে এটি হতে পারে। বাবা-মা, দাদা-দাদি অথবা ভাই-বোন কারো যদি বিপিডি থেকে থাকে তবে আপনার যে বিপিডি হবেই তা নিশ্চিত না হলেও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অনেক বিপিডি আক্রান্তেরই তাদের পরিবারের অন্য কারো বিপিডি থাকতে দেখা যায়। 

 

৩। ব্রেইন ফাংশনের কারনে: সব মানুষের ব্রেইন অবশ্যই একই রকমভাবে চিন্তা ভাবনা/ ফাংশন করে না। কিছু বিপিডি আক্রান্তদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের ব্রেইনের ইমোশন/আবেগ কন্ট্রোলের পার্টটা ঠিকমত অংশ নেয় না। তাদের আচরণ ও আবেগ-অনুভূতি গ্রহণ ও প্রকাশ আর সব মানুষের মত হয় না। তাদের ব্রেইনের কার্যপ্রণালীতেও এসব বিরূপ প্রভাব ফেলে।

 

বিপিডি এর বৈশিষ্ট্য/লক্ষণ গুলো কী কী? 

 

বিপিডি এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে, সাধারণত মোট ৯ টি বৈশিষ্ট্য থাকলেও এই ৯ টি বৈশিষ্ট্যের সবগুলো একজন মানুষের মধ্যে এইকসাথে, একই মাত্রায় দেখা যায় না। বিভিন্ন প্যাটার্নে এই ৯ টি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। 

 

১। অন্যদের দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় :- একাকীত্বের ভয় বা সবার অপছন্দনীয় হয়ে যাওয়ার ভয়। আপনার কোনো কথার টোনের সূক্ষ্ম পরিবর্তনও বিপিডি আক্রান্তের কাছে মনে হতে পারে আপনি তাকে পছন্দ করেন না। বন্ধু-বান্ধবরা হয়তো বলছে, তারা ব্যস্ত আছে তবে বিপিডি আক্রান্ত ব্যক্তিরা ব্যস্ত আছে জানলেও, বুঝতে পারলেও তাদের ব্রেইন তা মেনে নিতে পারে না। তাদের কাছে এটি একাকীত্বের ভয়ে পরিণত হয়ে যায়। তাই তারা সর্বদা তাদের কাছের মানুষদের বেশি মনোযোগের আশা করে বা সাথে থাকতে চায়। আবার কিছু  বিপিডি ভুক্তভোগীরা ভবিষ্যতের একাকীত্বের ভয়ে মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়াতেই চায় না। 

 

২। হঠাৎ রেগে যাওয়ার প্রবণতা :- বিপিডি আক্রান্তরা মুহূর্তের মধ্যেই রেগে যায়। হঠাৎ খুবই বাজে আচরণ করে বসতে পারে কিন্তু পরবর্তীতে তা নিয়ে আবার নিজে অপরাধবোধ করে। হঠাৎ করে রেগে যাওয়া ও পরবর্তীতে তার এই ইমপালসিভ আচরণে লজ্জিত হয়ে তার কাছের মানুষদের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়া। বিপিডি আক্রান্তদের মাঝে এই ধরনের আচরণ করার প্রবণতা দেখা যায়। 

 

৩। মানুষের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপনে সমস্যা :- বিপিডি আক্রান্তরা মানুষের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক চালিয়ে নিতে হিমশিম খায়। ছোট একটি ঘটনাও তাদের ব্রেইনে বড় কিছু ট্রিগার করে ফেলতে পারে। তারা কাউকে নিজের আদর্শ হিসেবে মনে করতে পারে আবার পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির কোনো কথা/কাজের জন্য তাকে একদম খারাপ মানুষ হিসেবে গন্য করতে পারে। এভাবে বিপরীতমুখীও হয়ে থাকে। তারা প্রায়ই অনিয়ন্ত্রিতভাবে অবচেতন মনেই অন্য মানুষের সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ/পরিবর্তন করে ফেলে। তাই মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। 

 

৪। আইডেন্টিটি ডিসটার্বেন্স/ আত্মপরিচয় নিয়ে শঙ্কায় থাকা :- তারা প্রায়ই তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে সংকটে ভুগে। “আমি হয়ত খুবই খারাপ একজন মানুষ!”,  “আমার সম্পর্কে মানুষের ধারনা কী খুবই বাজে?”, “আমি খারাপ বলে হয়তোবা আমার কাছের বন্ধুরা আমাকে আসলে বন্ধু ভাবে না!” এসব বিষয়ে তারা খুবই অনিশ্চয়তায় ভোগে। এভাবে সর্বদা অনিশ্চয়তায় ভুগা নিজের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে জানলেও তারা এসব চিন্তা-ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। 

নিজের পার্সোনালিটিকে খুব বাজে মনে করে এ নিয়ে অপরাধবোধ করে। তাই কখনও কখনও তারা নিজের পার্সোনালিটি ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের হঠাৎ পরিবর্তন করে ফেলে। অন্য কোনো রূপে তাদের পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করে। নতুন রূপ নিয়ে বা পার্সোনালিটির পরিবর্তন করে নতুন বন্ধু খোঁজার চেষ্টা করে। 

 

৫। অত্যাধিক মুড পরিবর্তন :- তাদের মুড স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিবর্তন হয়। পিরিয়ড বা কোনো হরমোনাল কারণ ছাড়াও তাদের ঘন ঘন মুড পরিবর্তন হতেই থাকে। তাদের এই মুড সুইং কোন নির্দিষ্ট প্যাটার্নে হয় না, মাসের কোন নির্দিষ্ট সময় বেঁধে হয় না। 

 

৬। অত্যাধিক আবেগতাড়িত আচরণ :- বিপিডি আক্রান্তদের আচরণ খুবই অনিশ্চিত হয়ে থাকে। আকস্মাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলে বা কখনো আকস্মাৎ বড় কোনো কাজ করে ফেলে। এর ফলে তাদের পারিবারিক জীবন, শিক্ষাগত জীবন ও চাকুরি জীবনেও অনেক অস্থিরতা/ অস্থায়ীতা থাকে। হুটহাট  পড়ালেখায় ব্রেক দেয়া থেকে পড়ালেখা বন্ধ করে ফেলার মত বড় সিদ্ধান্তও তারা আবেগতাড়িত ভাবে নেয়। পড়াশোনা, চাকরি ছেড়ে দেয়া/পরিবর্তনের মত বড়সড় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত তারা আবেগের বশে নিয়ে ফেলে। 

 

৭। প্রায়ই শূন্য বোধ করা :- প্রায়ই শূন্য শূন্য লাগা, নিজের কিছু নেই বা কেউ নেই এমন ধরনের অনুভূতিও হয়। নিজেকে নগণ্য মনে করা, ছোট করে দেখার প্রবণতা দেখা যায়। কখনো বিপিডি আক্রান্তদের মাঝে নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা দেখা যায়। 

 

৮। আত্মহত্যার/আত্নঘাতী প্রবণতা :- নিজের প্রাণনাশের চিন্তা বিপিডি আক্রান্তদের মাঝে বেশি হয় এবং এই চিন্তা তাদের মনে অনেক প্রায়শই দেখা দেয়। কখনো তারা আত্মহত্যার চিন্তা না করলেও নিজেদেরকে শারীরিক আঘাত করতে দেখা যায়। তাদের অনুভূতি বা পারিপার্শ্বিক তাদের কাছে বেশি পীড়াদায়ক হয়ে উঠলে তারা এসব করতে পারে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সাধারন মানুষের তুলনায় বিপিডি আক্রান্তরা ৪০ গুণ বেশি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকে এবং ৮%-১০% বিপিডি আক্রান্তরাই আত্মহত্যার কারণে মৃত্যুবরণ করে। 

 

৯। প্যারানয়া/ তীব্র চাপের অনুভূতি :- বিপিডি আক্রান্তরা অল্পতেও অধিক চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে, এবং এর ফলস্বরূপ তারা তীব্র মানসিক চাপে পড়ে যায়। তাদের এভাবে অধিক চিন্তিত হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এইরূপ তীব্র চাপের অনুভূতি গুলো সাময়িক হলেও তা মানসিক স্বাস্থ্যে খুবই বাজে প্রভাব ফেলে, এমনকি এরূপ মানসিক চাপ তাদের কিছু শারীরিক অসুস্থতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। করো কারো এর ফলে সাময়িক শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদি হয়।  

 

এসব শুনে মনে হতেও পারে যে, ‘বিপিডি তো তাহলে আমাদের সবারই আছে!’ কিন্তু নাহ। আমাদের সবার হয়ত সময়ে সময়ে এরকম সব অনুভূতি হয়, তবে আমাদের সবার বিপিডি আক্রান্তদের ন্যায় এসব অনুভূতি এতটা প্রকটভাবে হয় না। বিপিডি আক্রান্তরা এসব অনুভূতি গুলোর সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে যায় ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করে তথা বিপিডি এপিসোড এর মধ্য দিয়ে যায়। তারা যত নিয়মিত বিপিডি এপিসোডের মধ্যে দিয়ে যায় অন্য মানুষরা এত নিয়মিত এসব অনুভূতি পায় না এবং এতটা অনিয়ন্ত্রিত আচরণ প্রকাশ করে না। যেকোনো মানুষ একসাথে এতগুলো অনুভূতির কম্বিনেশনের মধ্য দিয়েও যায় না।

সামান্য একটু বিষয়ও বিপিডি আক্রান্তদের এসব অনিয়ন্ত্রিত আচরণের ট্রিগার করতে পারে, আসলে আমাদের কাছে কিছু সামান্য বিষয় মনে হতে পারে তবে বিপিডি আক্রান্তের কাছে তা হয়তো কোন শৈশব ট্রমার স্মৃতি। তাই বিপিডি আক্রান্ত বলে তাদের কোন অনুভূতি বা আচরণকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। বিপিডি নিয়ে স্টিগমা তৈরী করলে বিপিডি আক্রান্তদের মানসিক সাহায্য চাওয়ার মাত্রা কমে যেতে পারে। নিজের বিপিডি চিকিৎসা না করানো হলে পরবর্তী প্রজন্মের বিপিডি ভুক্তভোগী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।  

 

কীভাবে বিপিডি নিশ্চিত হওয়া যায়? 

 

বিপিডি নিশ্চিত হতে অবশ্যই পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ডায়াগনসিস করতে হবে। বিপিডি আক্রান্তদের মাঝে এমন অনেক আচরণ দেখা যায় যা অন্যান্য মানসিক অসুস্থতায়ও দেখা যায়। তাই কখনোই নিজে নিজেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না। বিপিডি’র ফলে আচরণের প্যাটার্নে যেসকল বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তা আরো কিছু মানসিক অসুস্থতায় দেখা যাওয়াতে বিপিডি আক্রান্তের এসকল আচরণ অনেক সময়ই অন্য কোনো মানসিক অসুস্থতা হিসেবে মিসডায়াগনোস হয়ে থাকে আবার এর বিপরীতটাও ঘটতে পারে। 

 

বিপিডি এর তীব্রতা অনুযায়ী এক একজন মানুষের জীবনে বিপিডি এক একরকম ভাবে প্রভাব ফেলে। ভুক্তভোগীদের নিত্যদিনের কার্যক্রমে কম কিংবা বেশি অনেক রকম ভাবেই প্রভাব থাকে বিপিডি’র। উপরন্তু বিপিডি আক্রান্তদের আরো অন্যান্য মানসিক অসুস্থতাও হয়ে থাকে। কেউ বিপিডি আক্রান্ত বলে তার সব আচরণের পিছনে যে বিপিডি-ই কাজ করছে তা কিন্তু নয়। আমেরিকার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ৮৮% বিপিডি আক্রান্তদের মাঝে এনজাইটি ডিসঅর্ডার দেখা গেছে, আবার ১০%-৩০% এর দেখা যায় এডিএইচডি(ADHD) তে ভুগতে, ১৫% বিপিডি আক্রান্তরা বিপিডি এর পাশাপাশি ভুগে বাইপোলার ডিসঅর্ডারে এবং ৫৩% বিপিডি আক্রান্তের মাঝে ইটিং ডিসঅর্ডারও লক্ষণীয়। বিপিডি আক্রান্ত কারো এরূপ একাধিক মানসিক অসুস্থতা থাকলে সেগুলোরও ট্রিটমেন্ট করতে হবে। 

 

বিপিডি এর চিকিৎসা কী?

 

বিপিডি চিহ্নিত করতে ও চিকিৎসায় সাইকোলজিস্ট অথবা সাইক্রিয়াটিস্ট এর শরণাপন্ন হতে হবে। সাইকোথেরাপি কিংবা প্রেসক্রিপশন মেডিকেশন ক্ষেত্র বিশেষে উভয় উপায়েই বিপিডি এর চিকিৎসা করা হয়। কিছু বিপিডি আক্রান্তরা নিজে থেকেই বিপিডি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় বয়সের সাথে বিপিডি এর তীব্রতা কমে আসে। 

 

সাইকোথেরাপি

 

বিপিডি চিকিৎসার অন্যতম একটি পন্থা হল সাইকোথেরাপি। সাইকোথেরাপি হল সাইকোলজিস্ট/ সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিজের বিপিডি নিয়ে কথা বলে নিজের অবস্থা ও অনুভূতি প্রকাশ করা। সাইকোলজিস্ট/ সাইক্রিয়াটিস্ট আক্রান্তের কথা শুনে আক্রান্তকে তার ইমোশনাল অবস্থার উন্নতি করতে সাহায্য করবেন। 

বিপিডি’র জন্য বহুল ব্যবহৃত কিছু সাইকোথেরাপি হল- 

 

১। ডায়ালেটিকাল বিহেভিয়ার থেরাপি (ডিবিটি) 

২। কোগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (সিবিটি)

৩। মেনটালাইজেশন বেসড থেরাপি (এমবিটি) 

 

প্রেসক্রিপশন মেডিকেশন ট্রিটমেন্ট:

 

বিপিডি এর প্রেসক্রিপশন মেডিকেশন ট্রিটমেন্ট করতে ডাক্তাররা সহজেই আগ্রহী হন না। কারন প্রেসক্রিপশন মেডিকেশন বিপিডি কে সম্পূর্ণ নির্মূল করে না আবার অনেক সাইড ইফেক্ট থাকে। তাই সাইক্রিয়াটিস্টরা বিপিডি আক্রান্তদের প্রেসক্রিপশন মেডিকেশন ট্রিটমেন্ট দিয়ে থাকলে তা হয় মূলত বিপিডি এর নির্দিষ্ট একটি লক্ষণ বা এর সাথে বিদ্যমান অন্য কোনো অসুস্থতার জন্য, যেমন- এডিএইচডি, ডিপ্রেশন, মুড সুইং, বাইপোলার ডিসঅর্ডার কিংবা এনজাইটি ডিসঅর্ডারের জন্য। 

 

নিজের মধ্যে যেকোনো মানসিক ডিসটার্বেন্স দেখা দিলে তা নিয়ে কথা বলতে হবে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে, সম্ভব হলে কাছের মানুষদের সাথে খোলামেলা কথা বলতে হবে যেন মানসিক অসুস্থতা সম্পর্ক নষ্টের কারণ না হয়ে যায়। তাই কাছের মানুষদের কেউ নিজের মানসিক অবস্থা নিয়ে কথা বলতে আসলে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়। খোলস থেকে বেরিয়ে এসে সাহায্য চাওয়াটা একটু কঠিন মনে হলেও তা জরুরী। নিজের আচরণের সাথে বিপিডি’র কিছু লক্ষণ মিললেও, নিজেই নিজের ডায়াগনসিস করা যাবে না অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কারো কিছু আচরণ দেখেই তার বিপিডি আছে বলে ইতি টানা যাবে না। 

 

References  

 

 

Contributor: Labiba Jahan Oishee

Institute of Education and Research, DU

Documentation Coordinator, GRACE